
নিজস্ব প্রতিবেদক : রাষ্ট্র-সংস্কারের নামে দেশজুড়ে যে আলোড়ন তোলা হচ্ছে, তা আসলে একটি “মিথ্যা বয়ান”—এমন বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন দেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তাঁর মতে, সংস্কারকে ঘিরে একটি কাল্পনিক পরিস্থিতি তৈরি করে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে, যার বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীতে ব্র্যাক ইন্সটিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট আয়োজিত এক সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এবং ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক নাওমি হোসাইন।
৩৮ সংস্কারে ‘হ্যাঁ-না’—অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া জনগণ : রেহমান সোবহান বলেন, সরকার ৩৮টি জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবের ওপর একটি মাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে, অথচ সাধারণ নাগরিকরা জানেনই না, ওই সংস্কার প্রস্তাবগুলোর ভেতরে কী আছে। তাঁর ভাষায়, “এটা আসলে একটি সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন প্রস্তাব।” তিনি প্রশ্ন তোলেন—যে সংস্কারের বিষয়বস্তু জনগণের কাছেই স্পষ্ট নয়, সে বিষয়ে গণভোট কিসের ভিত্তিতে?

‘জুলাই জাতীয় সনদ’—জনগণের কাছে অজানা দলিল : রাষ্ট্র-সংস্কার নিয়ে যে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর কথা বলা হচ্ছে, সে সম্পর্কেও সাধারণ মানুষের কোনো ধারণা নেই বলে মন্তব্য করেন রেহমান সোবহান। তাঁর মতে, “রাষ্ট্র-সংস্কার নিয়ে একটি কাল্পনিক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে।” তিনি বলেন, সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া, কোনো এককালীন কাগুজে ঘোষণা নয়। অথচ সংস্কার করা উচিত—এমন একটি বিমূর্ত ধারণা তৈরি করে সেটিকে অস্পষ্টভাবে গণভোটের মাধ্যমে নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিএনপি-জামায়াত জোটের নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন : প্রধান রাজনৈতিক জোটগুলোর ভূমিকাও সমালোচনার বাইরে রাখেননি এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, “আমি প্রধান দুটি জোটের কাউকেই দাঁড়িয়ে এ কথা বলতে শুনিনি যে, এখানে ৩৮টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আছে, যা আমাদের গণতন্ত্রকে নতুন করে ভাবার জন্য অপরিহার্য।” জনসচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পূর্ণ ব্যর্থতাকেই তিনি এর জন্য দায়ী করেন।
১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকার—সংস্কার বাস্তবায়নে অক্ষম :
রেহমান সোবহানের মতে, মাত্র ১৮ মাস দায়িত্বে থাকা একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষে সংস্কার বাস্তবায়ন করা আদৌ সম্ভব নয়। কারণ— সংস্কার মানে কেবল প্রস্তাব লেখা নয় সেটি সংসদে আলোচনা হতে হবে আইন হিসেবে পাস হতে হবে
এবং নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া ছাড়া সংস্কার কেবল কাগুজে বুলিই থেকে যায়।
‘
হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারি প্রচার—লোক দেখানো উদ্যোগ ? গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারের প্রচার কার্যক্রমেরও তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “আমরা পাচ্ছি আলী রীয়াজ, ব্যাংক খাতের কর্মচারী আর অল্প কিছু অসহায় এনজিও কর্মী—যাদের দেশের চারদিকে দৌড়াতে বলা হচ্ছে মানুষকে ‘হ্যাঁ’ বলতে রাজি করানোর জন্য।” তিনি একে একটি সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন ও লোক দেখানো উদ্যোগ বলে আখ্যা দেন।
মাহফুজ আলমকে খুশি করতেই কি এই আয়োজন ? সরকারের এই উদ্যোগের পেছনে রাজনৈতিক হিসাবও তুলে ধরেন রেহমান সোবহান। তাঁর সন্দেহ, “অধ্যাপক ইউনূস মাহফুজকে খুশি করতে সরকার এই পদক্ষেপ নিয়েছে।” তিনি বলেন, ছাত্র প্রতিনিধিরা উদ্বিগ্ন—দেশ যেন আগের অবস্থায় ফিরে না যায়। সেই উদ্বেগ প্রশমিত করতেই সরকার এমন একটি দৃশ্যমান কিন্তু অর্থহীন উদ্যোগ নিয়েছে।
রূঢ় বাস্তবতা: বাস্তবায়ন ছাড়া সংস্কার মূল্যহীন : সবশেষে রেহমান সোবহান বলেন, “যতক্ষণ না আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসে এবং সংস্কার বাস্তবায়ন করে, ততক্ষণ আসলে কোনো সংস্কার ঘটছে না।” লিখিত প্রস্তাবের কোনো মূল্য নেই, যদি তার বাস্তব প্রয়োগ না হয়। এই চক্রেই দেশ আটকে আছে—আর এর শেষ কোথায়, তা তিনি নিজেও জানেন না বলে মন্তব্য করেন।
